সর্বোচ্চ এক বছর মেয়াদি এ ঋণে নিয়মিত সুদের বাইরে অতিরিক্ত কোনো চার্জ বা ফি আরোপ করা যাবে না। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতাদের এক বৈঠকের পর গতকাল এ সিদ্ধান্ত আসে। ঈদুল ফিতরে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস দেয়ার সুবিধার্থে বৈঠকে গভর্নরের কাছে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বিশেষ ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়িক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী রফতানি, ক্রয়াদেশ পিছিয়ে যাওয়া ও তারল্য সংকটসহ নানা কারণে রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের সক্ষমতা কমে এসেছে। এজন্য উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রেখে রফতানির গতিধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়ন সহায়তা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ লক্ষ্যে সচল রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা যথাসময়ে পরিশোধের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের রফতানি সক্ষমতা ও দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি অক্ষুণ্ন রাখার লক্ষ্যে নির্দেশনা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ প্রদানের অনুমতি দিলেও কিছু শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্কুলারে বলা হয়েছে, সচল রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য চলতি মূলধন ঋণসীমার বাইরে প্রযোজ্যতা অনুসারে গ্রাহকের সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে মেয়াদি ঋণ সুবিধা দেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে ওই ঋণের পরিমাণ ঋণগ্রহীতা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিগত তিন মাসের প্রদত্ত গড় বেতন-ভাতার বেশি হতে পারবে না; ওই ঋণের বিপরীতে প্রচলিত বাজারভিত্তিক সুদহার প্রযোজ্য হবে এবং নিয়মিত সুদ ব্যতীত অন্য কোনো অতিরিক্ত সুদ, ফি বা চার্জ আরোপ করা যাবে না।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ সুবিধা দিলেও এ ঋণ সরাসরি প্রতিষ্ঠানে যাবে না বলেও সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, তফসিলি ব্যাংকগুলোতে সংশ্লিষ্ট শ্রমিক-কর্মচারীর ব্যাংক বা এমএফএস (মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা) হিসাবে সরাসরি ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন-ভাতা যাবে। এক্ষেত্রে ওই ঋণের অর্থ তিন মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ এক বছরে মাসিক বা ত্রৈমাসিক কিস্তিতে আদায় করতে হবে।
যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মোট উৎপাদিত পণ্যের ন্যূনতম ৮০ শতাংশ রফতানি হয় এবং যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের শ্রমিক-কর্মচারীদের ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে গত জানুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ করেছে, তারা সচল হিসেবে বিবেচিত হবে। আর সচল ও রফতানিমুখী হওয়ার বিষয়টি বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর মতো বাণিজ্য সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র দ্বারা সমর্থিত হতে হবে বলেও সার্কুলারে বলা হয়েছে।
এর আগে ২৪ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান ও সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী। বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে তারা বলেন, বৈশ্বিক মন্দা ও রফতানি আয় কমে যাওয়ায় দেশের তৈরি পোশাক খাতে আর্থিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। লিয়েন ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের নগদ সহায়তার আবেদন ঝুলে রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে এখনো প্রায় ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রণোদনা অনিষ্পন্ন রয়েছে। এ অর্থ দ্রুত ছাড় করা হলে কারখানাগুলোর চলমান তারল্য সংকট অনেকটাই নিরসন হবে। এ পরিস্থিতিতে রফতানির বিপরীতে প্রাপ্য নগদ সহায়তা ছাড় করা প্রয়োজন।
এদিকে বিশেষ ঋণ সুবিধা-সংক্রান্ত সার্কুলার জারির পর একে স্বাগত জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিজিএমইএ। এতে সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে পোশাক শিল্পের মালিকদের ওপর যখন শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বোনাস এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল পরিশোধের প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে ঠিক সেই মুহূর্তে এই অর্থ বরাদ্দ শিল্প মালিকদের জন্য বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে।’